আল্লাহ ভরসা…

আল্লাহ ভরসা…

আকিব খান

মাওলানা ইবাদুল ইসলামের ছেলেটা ঢাকায় পড়ে। সে জানালো, আব্বা অবস্থা খারাপ। সাবধনে থাকেন। মাওলানা চিন্তিত হলেও ছেলেকে বললেন- বাবা আল্লার উপর তওয়াক্কুল করো। তুমি শহরে আছ, তাই তুমি বেশি সাবধানো থাকবা। ছেলের কথায় এবং পরিস্থিতি বুঝে তিনি মাস্ক ব্যবহার করছেন, অন্যকেও সচেতন করছেন। 
বাজার ভরা মানুষে। পথে ঘাটে খেলার আসর। ছোট বড় সবার এখন অখন্ড অবসর। কাজ বন্ধ, স্কুল বন্ধ। কিছু শহুরে মানুষও এ সুযোগে বাড়ী এসেছে। সরকার বারবার নিরাপদে থাকতে বলছে। টিভিতে প্রতিনিয়ত বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর করুণ খবর আসছে। মাওলানা ইবাদুল ইসলামে বড় ভয় লাগছে এই বিশৃঙ্খল পরিবেশে। তার বড় ভয় লাগছে অজপাড়াগাঁয়ের অসচেতনতা দেখে। তাই সরকারি নির্দেশনা আসতেই এক মুহুর্ত দেরি করেননি জামাত সীমিত করতে। 
বুকে চাপা কষ্ট নিয়ে নামাজে দাঁড়ালো মাওলানা ইবাদুল ইসলাম। ইমামতির দায়িত্বে আছেন প্রায় চল্লিশ পয়তাল্লিশ বছর। সার জীবন মানুষকে আল্লাহর ঘরের দিকে ডেকেছেন। পিঠে হাত বুলিয়ে বুঝিয়ে, অথবা কঠোর হতে হলে তাই হয়ে মানুষকে নামাজে এনে দাঁড় করিয়েছেন। সেই মাওলানা ইবাদুল ইসলাম আজ মাইকে ঘোষনা করলেন, ঘরেই থাকুন। ঘরেই নামাজ পড়ুন।

 
শূন্য মসজিদে মাত্র নয় জন মুসল্লী নিয়ে জুমার নামাজের তাকবীর দিলেন তিনি। আল্লাহু আকবার…। মাওলানার কন্ঠ কেঁপে উঠলো। পানির ধারা গড়িয়ে এসে পৌছুলো তার সফেদ দাড়িতে। ঠিকঠাক তিলাওয়াও করতে পারছেন না। বুকের ভেতর লাভার মত জ্বলছে পাপ বোধ। বারবার মন বলছে, হায় খোদা! মাফ করো। আমার লিসানে তুমার ঘরে আসতে মানুষকে নিষেধ করছি। আমি নিকৃষ্ট, আমি বড় পাপী, আমি বড়ই পাপী।
গ্রামে ইতিমধ্যে কানাগুসা শুরু হয়ে গেছে। মাওলানার ঈমান দূর্বল। আল্লা ভরসা নাই। চায়ের স্টলের আড্ডায় কথা শুরু করলো মতি বেপারী, আরে দেখ দেখি কারবার। মুখে আল্লা খোদা অথচ বুকে নাই এক ফুটা ঈমান। মসজিদে যাইতে নিষেধ করে। সুর মিলায় জয়নাল, হ ঠিকই কইছেন বেপারী সাব। এই লোকটা ভন্ড। আমরারে ইসলামের কথা কয় কিন্তু নিজের দিলে কিছুই নাই। আরেকজন বললো, ডরায় ডরায়। আরে আমরা হইলাম মুসলমান, আমরার এইসব রোগ অইব? সবাই হ হ করে হাক দেয়। চায়েল স্টলে রাখা টিভিতে খবর হচ্ছে। বাংলাদেশে আজ আক্রান্ত এক হাজার। মারা গেছে চৌদ্দ জন। কিন্তু সকলের হৈ চৈয়ে সে আওয়াজ চাপা পড়ে গেছে।


মুহুর্তেই কথা ছড়িয়ে যায়। একজন থেকে আরেকজন। ছোঁয়াচে রোগটার থেকেও কথার গতি বেশি। দু এক দিনেই গ্রাম শুদ্ধু মানুষের মুখে মাওলানার ঈমান হারা হওয়ার বিষয়টি ভিত্তি লাভ করলো। এ জগতে মাওলানার চাইতে নিকৃষ্ট আর কেউ নাই। অনেকে মত দিলো মাওলানাকে গ্রাম ছাড়া করার। কয়েকজন বললো তার মসজিদে যাওয়া নিষেধ হোক। ঈমান হারা লোক। তার পিছনে নামাজ হবেনা। কেউবা সমাজ থেকে আলাদা করে দিতে একমত হলো।


মতি বেপারী পয়সাওয়ালা লোক। নামাজ রোজার পাশাপাশি সুদের ব্যবসাটাও সমান তালেই চালায়। লোকজন তার কথার অবাধ্য হয়না। এ দুঃসময়েও সে লোকজনের পাশে আছে। টাকা চাই? নাও তবে হাজারে এগারোশো দিও। এই হলো তার ফর্মুলা। অবশ্য সাথে সে এটাও বলে, জনসেবা করছি, টাকা না দিলে মানুষগুলো কোথায় যাবে। গ্রামবাসী সাবাস দিয়ে উঠে। আহা! লোকটা কত ভালো, এই সময়ে মানুষের সাহায্য করছে। 
শেষ পর্যন্ত মতি বেপারীর নেতৃত্বে একটা সালিশি বসেই গেলো। অপরাধী মাওলানা ইবাদুল ইসলাম। বাদী গ্রামবাসী। সালিশে মতি বেপারীই প্রধান প্রধান বিচারক। মাওলানা ইবাদুল ইসলাম মাথা নিচু করে বসে আছেন। একজন তার অপরাধ বর্ননা করলো। তারপর মতি বেপারী বললো, গিরামবাসী সবাই কন, মাওলানারে কি করা যায়?


গ্রামবাসীরা হৈহৈ করে উঠলো মাওলানার অপরাধের বিস্তারিত শুনে। এতদিন এই লোকের ইমামতিতে নামাজ পড়েছে বলে তওবা কাটলো। সামান্য রোগের ভয়ে যে লোক মসজিদ বন্ধ করে দেয় তার শাস্তি অবশ্যই হওয়া উচিৎ। বিভিন্নজন বিভিন্ন মত দিলো। হৈচৈয়ের মাঝে মতি বেপারী দাঁড়িয়ে বললো, আপনেরা থামেন, আমি বুঝতে পারছি সবাই কি চাইতেছেন। তবে মাওলানার কথাও শোনন দরকার। তারও কিছু কওয়ার থাকবার পারে। 
সবাই চুপ করে মাওলানা ইবাদুল ইসলামের দিকে তাকিয়ে রইলো। মাওলানা মাথা নিচু করেই উঠে দাঁড়ালেন। সমান্য আরবি সম্ভাষনের পর বললেন, আপনারা আপনাদের ইচ্ছামত যা খুশি শাস্তি দিতে পারেন। তবুও আমি বলব এখনো সময় আছে, সবাই সাবধান হন। রোগটার কোন চিকিৎসা নাই। এইসব মহামারী বিষয়ে আমাদের নবীজী (সাঃ) এর হাদীস হলো… মতি বেপারী হুংকার দিয়ে উঠলো। ঐ মাওলানা, তোমার মুখে হাদীস মানায় না। তুমার তো ঈমানই নাই। চুপ করো। আমরা আর তুমার কথা শুনবার চাইনা। 
সালিশি শেষ হলো অপরাধী মাওলানার কথা না শুনেই। বিচারক মতি বেপারী ঘোষনা করলো, মাওলানারে বের করে দেয়ার সিদ্ধান হইছিলো। কিন্তু আমি দিল নরম মানুষ। তাই সে কোথায় যাবে এইটা ভেবে সিদ্ধান্তটা বদল করলাম। মাওলানার শাস্তি হইলো- আজকের পর থাইকা সে মসজিদে যাইতে পারবনা। সমাজের কোন কামেই তারে ডাকা হইব না। তার যাওয়াও নিষেধ। এবং গিরামবাসীদের কাছে অনুরোধ করতেছি আপনেরা এই ঈমান হারার থাইকা দূরে থাকবেন। সকলেই সমস্বরে মতি বেপারীর জয়জয়কার করলো। তার দিল নরমের প্রসংশায় পঞ্চমুখ হয়ে বাড়ী ফিরলো।

 
মেয়ের জামাই ইটালীতে থাকতো। দেশে ফিরেছে কয়েকদিন হলো। আজ জামাই আসছে শশুর বাড়ী। মতি বেপারী আয়োজনের কমতি রাখেনি। খাসি, গরু সহ জামাইয়ের যা যা পছন্দ সব জোগার হয়ে গেছে। লোক পাঠিয়ে চামটা ঘাট থেকে তাজা দেশী মাছ, হোসেনপুরের অসিতীর মিষ্টিও আনানো হয়েছে। বাড়ীতে বিরট আয়োজন। সকাল বেলা জামাইকে সাথে নিয়েই নাশতা সেরে বাড়ী থেকে বের হয়েছিলো মতি বেপারী।
সালিশি শেষ করে বাড়ি ফিরে দেখলেন জামাই চলে গেছে। তার বাড়ীতে পুলিশ এসে বসে আছে কি সব জিঙ্গেস করার জন্য। মতি বেপারী চিন্তিত হলেও বিষয়টা আমলে নিলোনা। খারাপ কিছু হলে মেয়ে ফোন করতোই। 
পরদিন ফজরের আজানে জাগলো মতি বেপারী। অযু করার জন্য উঠতে গিয়েই টের পেল দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। ভাবলো হতেই পারে। শোয়ার সময় বুকটা হয়তো চাপ খেয়েছে। বয়সও তো কম হয়নি। কষ্ট হলেও অযু করে মসজিদে রওনা হলো। ভাবছে এবার হয়তো ইমামতিটাও লোকজন তাকে করতে বলবে। তারাতাড়ি মসজিদে যাওয়া দরকার। কিন্তু পথটা যেন ফুরাচ্ছেনা। দম শেষ হয়ে আসছে। সেই সাথে শুরু হলো কাশি। প্রচন্ড কাশি। থামছেইনা কোন মতে।


মসজিদে যাবার রাস্তাটা মাওলানা ইবাদুল ইসলামের বাড়ীর পাশ দিয়েই। তাহাজ্জুদ পড়ে জায়নামজে বসে ইস্তেগফার পড়ছিলেন তিনি। ফজরের হলে দাড়িয়ে পড়লেন নামাজে। চল্লিশ পয়তাল্লিশ বছর পর আজ তিনি একা নামাজে দাঁড়ালেন। সফেদ দাঁড়ি চোখের পানিতে ভিজছে। দীর্ঘ চার সিজদায় লুটিয়ে গ্রামবাসীদের সুবোধ দেয়ার জন্য মাওলার নিকট আরজ করলেন বারবার। নামাজ শেষে দোয়াতে শামিল রাখলেন সারা দেশের মানুষকে। 


দূরে কেউ খুব জোড়ে জোড়ে কাশছে। দোয়ারত মাওলানার কানে আওয়াজটা আসতেই দোয়া সংক্ষিপ্ত করলেন। কে কাশে? আশে পাশে তো কোন বাড়ী নেই। রাস্তায় কি কোন অসুস্থ ব্যক্তি আছে? হন্তদন্ত হয়ে বের হতে গিয়েও থেমে গেলেন। তাকে তো সবার থেকে আলাদা করা হয়েছে। গ্রামবাসী কেউ দেখলে আবার মতি বেপারী বিচার বসাবে। মাওলানা ইবাদুল ইসলাম জায়নামাজে ফিরে গেলেন। সূর্যোদয় হলে এশরাক পড়বেন। 
ফজরের পর বিরাট হৈচৈ শুরু হলো। মতি বেপারীর লাশ পড়ে আছে মসজিদের সিঁড়ির প্রথম ধাপে। অনেকেই তাকে দেখেছে কাশতে কাশতে দম বন্ধ হয়ে মরে যেতে। ভয়ে কেউ লাশের কাছে যাচ্ছেনা। গ্রাম জুড়ে হৈ হৈ করে উঠলো। কে কার আগে ঘরে গিয়ে দরজা দিবে সে প্রতিযোগীতাই চলছে এখন। বেলা উঠলো। অথচ গ্রামটা যেন ঘুমিয়ে আছে। কেউ নেই রাস্তা ঘাটে। মতি বেপারীর লাশে দিকে পিঁপড়ের দল মিছিল করে ছোটছে। কয়েটা মাছিও হা করা মুখটার উপর ভন ভন করছে।


মাওলানা ইবাদুল ইসলাম থানায় যোগাযোগ করলেন। থানার ওসি জানালেন ময়মনসিংহ থেকে লোক আসতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। মাওলানা চিন্তায় পড়ে গেলেন। লাশটা এতক্ষণ এভাবে পড়ে থাকবে? দাফন কাফনের প্রস্তুতি নেয়া দরকার। যাতে নমুনা নেয়ার পরেই দাফন করা যায়। কিন্তু লোকজন তো কেউ নেই। কে যাবে মতি বেপারীর কাছে? 
আল্লাহর সেরা সৃষ্টি ইনসানের এই অপমান হবে ? মাওলানা ইবাদুল ইসলাম মনে মনে বললেন, না তা হতে পারেনা। আমি থাকতে তা হবেনা।সদ্য ঢাকা থেকে ফেরা ছেলেটা আলাদা ঘরে থাকছিলো দুই দিন ধরে। সে এভাবে চৌদ্দ দিন থাকবে। তাকে ডাক দিয়ে মাওলানা ইবাদুল ইসলাম বললেন, বাবারে চলো ঈমানের পরিক্ষা দিয়া আসি। আল্লাহ ভরসা…..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *