আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহ রহঃ স্মৃতি চারণ শাহসাব তো কেউ নেই ২

‘কেবল চিন্তা ও জ্ঞানিক ভাণ্ডার নিয়ে বসে থাকলেই চলবে না, তার সাথে আমল ও তৎপরতাও সমান প্রয়োজন; বরং সেটাই বেশি প্রয়োজন।’ এই মতই পোষণ করতেন হজরত আনোয়ার শাহ মরহুম। সে জন্যে জীবনের প্রতিক্ষণেই, রাসুলের হাদিসের ওপর, সেই সুবাদে সুন্নতের ওপর আমল করতেন। রাসুলের সুন্নতের প্রতি তাঁর এই স্বনিষ্ঠ আচরণ বাস্তবিকই ছিলো বেশ বিস্ময়কর। তিনি বলতেন, ‘কম কথা বলার কারণে লোকে বলে আমি অহংকারী। রাসুল তো বলে গেছেন চুপ থাকো, নাজাত পাবে।’ তাই তিনি অধিক সময় চুপ থাকতেন। রাসুলের সুন্নতের ওপর আমল করতেন।

তিনি সুন্দরের আকর ছিলেন। তাঁর দৈহিক সৌন্দর্য ছিল নজরকাড়া। ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত কেতাদুরস্ত লোক। সিদ্ধান্তগ্রহণে বাস্তবানুগ। তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল প্রভাবক। ঈর্ষণীয় জাহেরি সৌন্দর্যের পাশাপাশি বাতেনি সৌন্দর্যেও তিনি ছিলেন কামেল পুরুষ। জীবনযাপনে প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর ছিল এক আদর্শময় অনুপম চারিত্র। তাঁর ব্যবহারের মাধুর্যতায় অভিভূত হতেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

সমাজের সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষের কাছে পরম শ্রদ্ধেয়, সম্মানীয় ও আস্থাভাজন অনুকরণীয় এক বিশাল ব্যক্তিত্ব ছিলেন হজরত মরহুম। তাঁর প্রভাব ছিল অতুলনীয়। তিনি ধারেও কাটতেন আবার ভারেও কাটতেন।
ঐতিহাসিক শহিদি মসজিদের খতিবের আসনটিকে আভিধানিক অর্থেই তিনি অলংকৃত করে রেখেছিলেন। দীর্ঘকালের খতিব তিনি। একবার আমি হুজুরকে খতিবের বয়সসীমা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘1.1.1977 নিয়োগ আমার।’ আমি বললাম, ‘আপনার খতিবগিরির ভেতরে কত কত বার্ষিক গেলো, কত দশক, যুগ—আবার গেলো রজতজয়ন্তী, রুবিজয়ন্তী। আসছে সূবর্ণজয়ন্তী।’

দীর্ঘ ৪৩ বছর এ মিহরাবকে নিজ সৌন্দর্য ও সৌখিনতার মাধ্যমে সুসজ্জিত করে রেখেছিলেন। সেখানে দাঁড়িয়ে মুসলিম উম্মাহকে আজীবন তিনি পথ নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও সংকটাপন্নাবস্থায় তিনি জাতিকে দিয়েছেন সাহসিকতাপূর্ণ সঠিক দিক নির্দেশনামা। যার চাক্ষুষ সাক্ষী আজকের দাওয়াতে তাবলিগের ব্যাপারটি। তিনিই সর্বপ্রথম তাঁর মিম্বার থেকে এতাআতিদের মুখোশ উন্মোচন করেন। আজকের পৃথিবী যখন ইসলামের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত নির্যাতন, দমনপীড়ন, দখল ও হত্যার উৎসবে মেতে উঠছে—ইরাক, ইরান, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান ও সিরিয়াসহ বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে ধ্বংসের হোলিখেলায় মেতে উঠেছে তথাকথিত সভ্য শ্বেত উল্লুকের দল, তখন ওআইসির মতো মুসলিম সংগঠনও এদের বিরুদ্ধে যেতে সাহস করেনি। কিন্তু অকুতোভয় নির্বিক মহান এই ধর্মীয় নেতা বলিষ্ঠ কণ্ঠে এর প্রতিবাদ করে গেছেন। কঠিন হতে কঠিনতম পরিস্থিতিতেও তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ভাব গাম্ভীর্য বজায় রেখে দৃঢ় কণ্ঠে দিয়েছেন জাতিকে পথের দিশা।

আজ তিনি নেই। তাঁর শূন্যতা সত্যিই পূরণ হবার নয়। তাঁর এ শূন্য মসনদও আর পূরণ হবে না। জুমার পূর্বে বয়ান রেখে সুন্দরভাবে নামাজ পড়াবার যোগ্য লোকের অভাব হবে না। কিন্তু জাতিকে ভারসাম্যপূর্ণ একটি প্লাটফর্মে এনে সঠিক দিক নির্দেশনা দেবার এবং সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য ও সমাদৃত হবার মতো ওজনদার ভাষণ দিয়ে সন্তুষ্ট ও তৃপ্ত করার মতো ব্যক্তিত্ব আদৌ খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা, এ সন্দেহ যেন মন থেকে দূর করাই যাচ্ছে না।

চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখি—

শাহসাব তো কেউ নেই!
শাহসাব তো কেউ নেই!
শাহসাব তো কেউ নেই!

রাত ২.৫০

লেখকঃ সালাহউদ্দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *